পহেলা ফাল্গুন ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে দেশের সর্ববৃহৎ তাহিরপুরের জয়নাল আবেদীন শিমুল বাগানে বসেছে প্রাণের মেলা। ছবি : জৈন্তা বার্তা
চারদিকে শিমুল ফুল থেকে থেকে দোল খাচ্ছে বসন্তের পাগলা হাওয়ায়। সে মায়ায় চোখ না জুড়াতেই ক্ষণে ক্ষণে ভেসে আসা মনোমুগ্ধকর কোকিলের কুহুতান জানান দিচ্ছে বসন্ত এসে গেছে।
স্নিগ্ধ বাতাসে হালকা ঠাণ্ডার অনুভূতি, একপাশে পাহাড় আর মাঝখানে জাদুকাটা নদীর ঢেউ। অন্যদিকে নতুন গজানো সবুজ পাতায় যেন ফাগুনের আগুন ধরেছে সুনামগঞ্জের হাজি জয়নাল আবেদিন শিমুল বাগানে।
প্রায় দুই হাজার গাছের শিমুল বাগানটির অবস্থান তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তগ্রাম মানিগাঁওয়ে বিস্তীর্ণ বালুপ্রান্তর ঘেরা প্রকৃতিসুন্দর স্থানে। প্রতি বছরের মতো এবারও ভালোবাসা দিবস আর ফাল্গুন উদযাপন করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এসেছেন এ শিমুল বাগানে।
বুধবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই দর্শনার্থীদের পদচারণার আরও রঙিন হয়ে ওঠে শিমুল বাগান। যাদুকাটা পাড়ে শিমুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয় মানুষ। শত শত শিমুলও দোল খেয়ে বাসন্তী অভিবাদন জানায় তাদের। বসন্তরাঙা ভালোবাসার দিনের প্রিয় মানুষের হাতে হাত রেখে মনের অজান্তেই অনেকে গুনগুনিয়ে ওঠেন প্রেমের গান।
অনেকে আবার প্রাণ খুলে গলায় ধরেন এই অঞ্চলের বাউল মহাজন শাহ আবদুল করিমের গান ‘বসন্ত বাতাসে সইগো...’।
এই শিমুল বাগান তৈরির গল্পে বাগানের স্বত্ত্বাধিকারী রাকাব উদ্দিন জানান, দুই যুগেরও বেশি আগে তাহিরপুর উপজেলার সোহালা গ্রামের শিক্ষানুরাগী ও বৃক্ষপ্রেমি জয়নাল আবেদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে মানিগাঁওয়ের যাদুকাটা নদীর দক্ষিণে বিস্তীর্ণ বালুময় প্রান্তরে দুটি শিমুল গাছ দেখেন। বালু ফুঁড়ে যেন বেড়িয়ে এসেছে নয়নাভিরাম স্বর্গীয় বৃক্ষ। ন্যাড়া মাথায় শিমুলের ফুল বসন্তের পাগলা হাওয়ায় দুলছে। আর ডালে লেজ দোলাচ্ছে পাখি।
এই দৃশ্য দেখে বৃক্ষপ্রেমি জয়নাল মনস্থির করেন, পুরোটা জায়গা কিনে শিমুল বাগান করবেন। যেই ভাবনা, সেই কাজ। তিনি প্রায় ৩৩ একর জায়গা কিনে পরিচিত উদ্ভিদ বিশারদ কয়েজনের পরামর্শ নিয়ে সংগ্রহ করেন শিমুল গাছের চারা। সারি সারি গর্ত খুঁড়ে শুরু হয় তার শিমুল গাছ লাগানোর কর্মযজ্ঞ।
বালুময় প্রান্তরে লাগিয়ে দেন দুর্বাঘাস। নাওয়া-খাওয়া ভুলে রাতদিন বাগানের তদারকি শুরু করেন। তার পুরোটা সময়ই কাটতো বাগান ঘিরে। পুরো জায়গায় গাছ লাগানো শেষ হলে সারি সারি শিমুল গাছ দেখে প্রাণ জুড়িয়ে যায় তার। বৃক্ষগুলোতে বাঁচিয়ে রাখতে দুর্গম মরুময় প্রান্তরে পানি, গোবর সংগ্রহ করতে শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করেন। পরামর্শ নেন কিভাবে গাছগুলো বাঁচিয়ে রাখা যায়। এক বছর পরই গাছের ডালপালায় ছাতার মতো ছায়াময় হয়ে ওঠে পুরো বাগান।
ধিরে ধিরে গাছগুলো বড় হতে থাকলে, প্রাণ জুড়ায় জয়নাল আবেদিনের। অদ্ভুত ভালো লাগায় ভরে ওঠে তার মন। প্রতিদিন ঘুম ভাঙতেই বাড়ি থেকে বাগানে ছুটে আসতেন।
রাকাব জানান, ২০০৬ সালে ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় জয়নাল প্রাণ হারান। এর মধ্যে শিমুল গাছগুলো বড় হয়ে গেছে। তার শখের বাগানে ফাল্গুনে হাজার হাজার মানুষ শিমুলের সৌন্দর্য উপভোগ করছে, এই দৃশ্য দেখে যেতে পারেন নাই। অথচ এটা দেখার জন্যই তিনি এই বাগান করেছিলেন।
২০১১-২০১২ সালের দিকে শিমুল বাগানে ফুল ফুটতে শুরু করে বলে জানান বাগানের আরেক স্বত্ত্বাধিকারী আফতাব উদ্দিন। বলেন, দুর্গম যোগাযোগহীন অজপাড়াগাঁয়ে বসন্ত রঙে আগুন হয়ে ওঠে বাগানটি। পত্রহীন ন্যাড়ামাথার ডালগুলোতে শুধুই লাল শিমুলের বিস্তার। কিন্তু যোগাযোগ বিড়ম্বমনার কারণে প্রকৃতিপ্রেমি বা ভ্রমণার্থীরা এসে দুর্ভোগে পড়েন।
২০১৩-২০১৪ সালের দিকে জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে শিমুল বাগান নিয়ে প্রতিবেদন হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ বাগানের খবর ছড়িয়ে পড়লে বিদেশের প্রকৃতি প্রেমিদের নজর কাড়ে। তারাও পরিবার নিয়ে ছুটে আসেন বসন্তকালে, ভালোবাসার দিনে হাত ধরে হাঁটাহাঁটি করেন।
এ বছর জেলা শিল্পকলা একাডেমি তাদের সঙ্গে কথা বলে শিমুল বাগানে বসন্ত উৎসবের আয়োজন করেছে বলে জানান রাকাব।
বসন্ত উৎসবের জন্য হলুদ আভায় তৈরি করা হয়েছে আকর্ষণীয় মঞ্চ। এই মঞ্চে বসন্ত বরণের গান, নাচ, কবিতা আবৃত্তি ও আলোচনাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান হবে। উন্মুক্ত এ অনুষ্ঠানটি দেখতে ইতোমধ্যে সংস্কৃতি অনুরাগী ও দর্শনার্থীরা ভিড় করেছেন।
সুনামগঞ্জ জেলার কালচারাল অফিসার আহমেদ মঞ্জরুল হক চৌধুরী পাভেল বলেন, শিমুল বাগানের বসন্ত উৎসব উপভোগ করতে সারাদেশ থেকে লোকজন ছুটে এসেছেন। আমরা এই অঞ্চলের মহাজনদের বিভিন্ন সৃষ্টি পরিবেশনা করব। নাচ, কবিতা ও গানে গানে বসন্তকে স্বাগত জানাতে আমরা প্রস্তুত।
পহেলা ফাল্গুন ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে দেশের সর্ববৃহৎ তাহিরপুরের জয়নাল আবেদীন শিমুল বাগানে বসেছে প্রাণের মেলা। সব বয়সী মানুষ ছুটে এসেছেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে। শত ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবার পরিজন নিয়ে ছুটে এসেছেন প্রাণ ভরে উপভোগ করতে। বসন্ত ও ভালোবাসা দিবসকে আরো রঙ্গিন করতে সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমির বসন্ত বরণ উৎসবের আয়োজন করা হয়। বুধবার (১৪ফেব্রুয়ারি) সকালে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার আবু আহমদ ছিদ্দীকী। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রাশেদ ইকবাল চৌধুরীর সভাপতিত্বে আরো বক্তব্য রাখেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ এহসান শাহ, জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. শামছুল আবেদীন।সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন জেলা কালচারাল অফিসার আহমেদ মঞ্জুরুল হক পাভেল।
দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিল্পীদের গান, নাচ, আবৃত্তি ও সুনামগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ধামাইল। এছাড়াও সুনামগঞ্জে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের নৃত্য। সবমিলিয়ে জাতি, ধর্ম, বর্ণ ভেদে সুনামগঞ্জে পালিত হয়েছে বসন্ত উৎসব।
জৈন্তাবার্তা/জেএ




