ছবি : সংগৃহীত
সুনামগঞ্জের তিনটি বর্ডার হাট ও আশপাশ এলাকা এখন ভারতীয় চিনি পেঁয়াজের বন্দর হিসেব পরিচিতি লাভ করেছে। প্রতি হাটবারে গভীর রাত পর্যন্ত কোটি কোটি টাকার ভারতীয় চিনি, পেঁয়াজ শুল্ক ফাঁকি দিয়ে সীমান্তের এপারে আসছে। সম্প্রতি (১১ ফেব্রুয়ারি) আইন—শৃঙ্খলা সভায় এই বিষয়ে কথা বলেছেন দায়িত্বশীলরা। জেলা প্রশাসক রবিবার এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, সোমবার সিলেটে বিজিবি’র সেক্টর কমান্ডারগণসহ বিভাগীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাগণের বৈঠকে এই বিষয়ে কথা বলবেন তিনি।
সুনামগঞ্জ সীমান্তের তিনটি বর্ডার হাটের প্রথমটি হচ্ছে, ডলুরা—বালাট সীমান্ত হাট। যা ২০১২ সালের ২৪ এপ্রিল সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জাহাঙ্গীর ইউনিয়নের ডলুরা এলাকায় এবং ভারতের মেঘালয়ের বালাট সীমান্ত এলাকায় চালু হয়। এই হাট বসে সপ্তাহের প্রতি মঙ্গলবার। এখানকার ৫০টি দোকানকে দুই দেশের মধ্যে ভাগ করে দেয়া আছে।
এই সীমান্তের দ্বিতীয় বর্ডার হচ্ছে— দোয়ারাবাজার উপজেলার ভোগলা ইউনিয়নের বাগানবাড়ি বর্ডার হাট। ভারতের মেঘালয়ের রিংকু ও বাগানবাড়িতে এই হাটের অবস্থান। এই হাট বৃহস্পতিবার বসে। এই হাটের ৫০টি দোকানকেও দুই দেশের দোকানীদের ভাগ করে দেওয়া।
সীমান্তের তৃতীয় এবং দেশের ১৪তম বর্ডার হাট হচ্ছে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্তের লাউড়েরগড় ও ভারতের পশ্চিম হিল সীমান্তের সায়েদাবাদ বর্ডার হাট। এই হাট বুধবার বসে থাকে। এখানেও একইভাবে দোকান ভাগ করে দেয়া আছে। প্রতি হাটে বাংলাদেশের ক্রেতা কার্ড আছে পাঁচশ থেকে সাড়ে পাঁচশ’ এর মত।
সকাল ১০টায় শুরু হয়ে বিকাল ৪টায় বর্ডার হাটের কেনাকাটা শেষ হবার কথা থাকলেও গেল প্রায় ছয় মাস হয় গভীর রাত পর্যন্ত এই হাট দিয়ে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে কোটি কোটি টাকার ভারতীয় চিনি, পেঁয়াজ, নাসির উদ্দিন বিড়ি, কমলা ও বিভিন্ন ধরণের চকলেট ও কসমেটিক্স ঢুকছে দেশের অভ্যন্তরে।
দোয়ারাবাজারের বাগানবাড়ি—রিংকু বর্ডার হাটের গেল দুই বৃহস্পতিবারের ভিডিও চিত্রতে দেখা গেছে, সীমান্তের ওপার থেকে শত শত কাভার্ড ভ্যানে কোটি কোটি টাকার মালামাল এসেছে এবং এপারের বাজার থেকে ভ্যান, অটো রিক্সাসহ নানা যানবাহনে এই মালামাল সীমান্ত হাট থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বিভিন্ন অঞ্চলে। একই ধরণের একটি ভিডিও পাওয়া গেছে, লাউড়েরগড় বর্ডার হাটেরও।
দোয়ারাবাজারের বাগানবাড়ি—রিংকু বর্ডারহাটের একজন বাংলাদেশী দোকানী বললেন, প্রতি হাটবারে চল্লিশ হাজার থেকে ৫০ হাজার ক্যারেট চিনি, পেঁয়াজ, আলু, আপেল, কমলা ও নারিকেল নামছে এপারে। যা এখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নৌকা ও ট্রাকে চলে যাচ্ছে। বাজার কমিটির লোকজনকে ক্যারেট প্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা দিলেই নামতে কোন বাধা নেই। এখানে যারা টাকা তোলার কাজ করে তারা ভোগলাবাজার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের ঘনিষ্টজন।
ওখানকার একজন ব্যবসায়ী (কার্ডধারী ক্রেতা) ইসমাইল হোসেন অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে বললেন, প্রতি কার্ডে ২০—২৫ হাজার টাকার বেশি মালামাল নামানো হয় না। এর বাইরে সামান্য কিছু মালামাল বিজিবি ও বাজার কমিটির লোকজনকে ৫০০—১০০০ টাকা দিয়ে নামানো যায় বলে স্বীকার করলেন তিনি। তবে বেশি মালামাল নামানো যায় না বলে দাবি করেন ইসমাইল।
দোয়ারাবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আসিক মিয়া জানালেন, বৃহস্পতিবার হাটে গেলে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আসা মালামালের বন্দর দেখতে পারবেন। গেল বৃহস্পতিবারের কিছু ভিডিও ফুটেজ এই প্রতিবেদককে পাঠিয়ে তিনি বললেন, এগুলো বিজিবি ও বাজার কমিটির লোকজনকে ফাঁকি দিয়ে তোলা। তারা দেখলে মোবাইল বা ক্যামেরা বের করতে দেয় না।
স্থানীয় একজন ইউপি সদস্য নিজের নাম পরিচয় উদ্ধৃত না করার অনুরোধ করে বললেন, সরেজমিনে ছদ্মবেশে এসে দেখে যান, প্রতি বৃহস্পতিবার কত কোটি টাকার মালামাল নামছে। আশ্চর্য হয়ে যাবেন আপনি।
বোগলা বাজার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মিলন খান বললেন, এখানে দুই দেশের বাজার কমিটি আছে। কারও কাছ থেকে টাকা নিয়ে বেশি মালামাল নামানোর কোন সুযোগ নেই। এ ধরণের অভিযোগ সত্য নয়।
কেবল বাগানবাড়ি—রিংকু বর্ডার হাট নয় জেলার লাউড়েরগড় ও সুনামগঞ্জ সদরের ডলুরা বর্ডার হাটেও নিয়ম বহিভূর্তভাবে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে মালামাল নামছে বলে সম্প্রতি (১১ ফেব্রুয়ারি) আইন—শৃঙ্খলা সভায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও বিজিবির অধিনায়কসহ দায়িত্বশীল অনেকেই উত্থাপন করেছেন
সুনামগঞ্জ ২৮ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্ণেল মাহবুবুর রহমান বললেন, একটি জেলার সীমান্তে তিনটি বর্ডার হাট দেশের অন্য জেলায় আছে বলে আমার জানা নেই। এখানকার মানুষের জীবন যাপনের মানোন্নয়নের জন্যই এটি করা হয়েছে। কিন্তু কিছু মানুষ এর অপব্যবহার করার চেষ্টা করছে। বর্ডার হাটগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি গেল আইন—শৃঙ্খলা কমিটির সভায় আমিও উত্থাপন করেছি। এখানে বিজিবি কেবল নিরাপত্তার বিষয়টি দেখার কথা। কে কত টাকার মালামাল নিচ্ছে, সেটি দেখার এখতিয়ার বিজিবি’র নেই। পেঁয়াজ, চিনি নিয়ম বহিভূর্তভাবে নামার বিষয়টি তিনিও জেনেছেন জানিয়ে বললেন, আমিও আইন—শৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে রাখার তাগিদ দিয়েছি। বিজিবির কোন সদস্য ওখানে কোন অপরাধ কর্মে যুক্ত হবার অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেবার কথা জানান তিনি। বর্ডার হাটগুলোতে চার—পাঁচ ঘণ্টার জন্য একজন ম্যাজিস্ট্রেট থাকা জরুরি হয়ে পড়ছে বলে মন্তব্য করলেন এই বিজিবি কর্মকর্তা।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রাশেদ ইকবাল চৌধুরী বললেন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বর্ডার হাটের কার্যক্রম দেখভাল করেন। আগের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বদলি হওয়ায় নতুন একজন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট যোগদান করেছেন। তিনি খেঁাজ খবর নেবেন, সরেজমিনে গিয়ে দেখবেন। এরপর কীভাবে বর্ডারহাটকে শৃঙ্খলার মধ্যে রাখা যায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া সোমবার সিলেটে বিভাগীয় কমিশনার মহোদয়ের কার্যালয়ে বিজিবি’র বিভাগীয় কর্মকর্তারাও থাকবেন, সেখানে বিষয়টি উত্থাপন করা হবে।
এদিকে, গেল কয়েক মাসে সুনামগঞ্জের সীমান্ত এলাকাজুড়ে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে নামা ভারতীয় চিনি ও পেঁয়াজ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পেঁৗছে দিচ্ছে এখানকার চোরাচালানীরা। চোরাচালানীদের সহয়োগিতা করছে স্থানীয় কিছু অসৎ জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক কর্মী ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও।
বিশ্বম্ভরপুর—সুনামগঞ্জ সড়ককে নিরাপদ সড়ক হিসেবে ব্যবহার করে রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পেঁৗছে দেওয়া হচ্ছে এসব চোরাই পণ্য। এছাড়া রক্তি নদী হয়ে জেলার নদীবন্দর খ্যাত সাচনা বাজারেও যাচ্ছে প্রতিদিন শত শত বস্তা পেঁয়াজ ও চিনি।
বিশ্বম্ভরপুরের একজন গণমাধ্যম কর্মী জানান, উপজেলার সীমান্ত রাজাপুর, মাছিমপুর ও ডলুরা দিয়ে কোটি কোটি টাকার চিনি, পেঁয়াজ প্রতিদিন এপারে আসছে। তাহিরপুরের লাউড়েরগড় ও দিঘারতলা। দোয়ারাবাজারের কলাউড়া, বাঁশতলা, মুকামচড়া, লক্ষীপুর ইউনিয়নের ভাঙাপাড়া, মাঠগাঁও, বোগলাবাজার ইউনিয়নের পেকপাড়া, ইদিকুনা ও কইয়াজুরি এলাকাকে নিরাপদ জোন হিসেবে ব্যবহার করছে চোরাকারবারীরা।
সাচনা বাজারের একজন ব্যবসায়ী জানালেন, প্রতি রাতে রক্তি নদী হয়ে নৌকায় এবং আব্দুজ জহুর সেতু এলাকা থেকে গাড়িতে কমপক্ষে ৭০০ বস্তা চিনি, ৫০ বস্তা পেঁয়াজ আসে কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছে। তারা এগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রয় করেন। নৌ—পথেই এসব মালামাল পেঁৗছানো হয় বেশি।
জৈন্তাবার্তা/এমকে




