জামালগঞ্জে এ বছর মেম্বারদের (ইউপি সদস্য) একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট হাওর রক্ষা বাঁধের কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে। সুযোগসন্ধানী ওই চক্রের কাছে কৃষকের স্বার্থের বদলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনৈতিক স্বার্থই প্রাধান্য পেয়েছে। সিন্ডিকেটধারী সদস্যরা সংশ্লিষ্টদের হাতে ‘চা—পানের খরচ’ এর নাম করে মোটা অংকের অর্থ তুলে দিয়ে নিজেরা পিআইসি হয়েছেন। অনেকেই নামে-বেনামে একাধিক পিআইসিরও নেতৃত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি অন্য পিআইসিদের কে কত উৎকোচ দিয়ে পিআইসির মালিক হয়েছেন সে খবরও তাদের কাছে পাওয়া গেছে।
এমনকি বিলের টাকা উত্তোলনের সময়ও ‘ফাইভ পার্সেন্ট’ উৎকোচ দিয়ে কৃষকের স্বার্থকে ধুলিস্যাৎ করার পাঁয়তারায় লিপ্ত রয়েছে তারা, এমন অভিযোগও আছে। কৃষকের ফসল রক্ষায় সরকারের বরাদ্দকৃত কোটি কোটি টাকা তছরুপের কাজে কলকাঠি নাড়ছেন উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পিআইসিপ্রাপ্ত ইউপি সদস্য ও একাধিক পিআইসির সভাপতিসহ অনেকের সাথে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পিআইসির এক সভাপতি বলেন, ‘টেকা তো দিছেই। দিছে না কেডা, সবাই তো দিছে। টেকা না দিলে কী পিআইসি পাইবো কেউ? কেউ পিআইসি পাইতো না। এইডা আফনে জানইন, সবাই জানে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যারা বেশি পিআইসি পাইছে এরা বেশি দিছে। মহাইল্যা (মহালিয়া) হাওরে দেবাশীষ মেম্বার একলাই তিনডা পাইছে। একটা তার নামে, বাকি দুইডা রাসেন্দ্র সরকার ও লিটন চক্রবর্তীর নামে।’
পরিচয় গোপনের শর্তে ইউপি সদস্য ও পিআইসির এক সভাপতি বলেন, আমি এমনিতে কোন টাকা দিছি না। তবে খরচাপাতির লাগি দিছি। আর অন্যরার কাছ থাইক্যা তো কন্টাক কইরা টেকা নিছে। টেকা নেওয়ার যে বিষয়ডা এইডা এক্কেবারে সঠিক। আমার জানা মতে চার—পাঁচজনের কাছ থাইক্যা পঞ্চাশ হাজার টাকা কইরা নিছে। বিলের চেক নেওয়ার সময়ও ‘ফাইভ পার্সেন্ট’ কইরা দেওন লাগছে।
বেনামে একাধিক পিআইসি পাওয়া এক ইউপি সদস্য এ প্রতিবেদকের সাথে দীর্ঘ কথোপকথনের একপর্যায়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, ‘জামালগঞ্জে যে অফিসারই আসে সে অফিসারই এখান থেকে বড়লোক হয়ে যায়। এ বছর অনেকেই টাকা দিয়া পিআইসি পেয়েছে। নতুন বিল যেটা দেওয়া হচ্ছে সেখান থেকে ‘ফাইভ পার্সেন্ট’ নিতে চাইতেছে। কিন্তু আমি দিব না বলে বিষয়গুলো সুনামগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতাদের জানানোর অনুরোধ করেন তিনি।’
কথা বলার একপর্যায়ে ওই ইউপি সদস্যের মোবাইলে একটি ফোন আসে। তিনি ফোনের অপর প্রন্তে থাকা লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘রাসেল ভাই চেক (বাঁধের কাজের বিলের চেক) দিছেন। নূরুল (ছদ্মনাম) আইছেÑ তারে দিয়া দেন তে। কইছি তো, পার্সেন্টিজ তো টেকা তুইল্যা দিমু রে ভাই আপনারে। চেকটা দিয়া দেন ভাই।’ কথোপকথনের রেকর্ড এ প্রতিবেদকের কাছে সংগ্রহে আছে। রাসেল কে? প্রশ্ন করলে ‘রাসেল এসওর (পাউবোর শাখা কর্মকর্তা) সহকারী’ বলে জানান ওই ইউপি সদস্য।
২০২৩—২০২৪ অর্থবছরের পিআইসি তালিকা ঘেঁটে দেখা যায়, এ বছর ১৫ থেকে ২০ জন সাবেক ও বর্তমান ইউপি সদস্যকে পিআইসির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এদের অনেকে নামে—বেনামে একাধিক পিআইসির নেতৃত্বও দিচ্ছেন। শনির হাওরের ১ নম্বর পিআইসির দায়িত্বে বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য সফর উদ্দিন ও ৭ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য যীশু তালুকদার, ২ নম্বর পিআইসির দায়িত্বে ৪ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য জয়নাল আবেদীন, মহালিয়া হাওরের ৭ নম্বর পিআইসি ২ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য দেবাশীষ তালুকদার রয়েছেন। এছাড়া ৬ ও ৮ নম্বর পিআইসির অঘোষিত সভাপতিও তিনি। ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য গোপীনাথ চৌধুরীর নামে আছে হালি হাওরের ১৪ নম্বর পিআইসি। একই ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মানিক লাল দাসের নামে আছে ২৫ নম্বর পিআইসি। ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত ইউপি সদস্য বেবী রানী তালুকদারকেও ২টি পিআইসি দেওয়া হয়েছে। তবে তালিকায় তার নিজের নাম না থাকলেও সত্যেন্দ্র তালুকদার ও জীবন কৃষ্ণ তালুকদারের নামে ২৩ এবং ৯ নম্বর পিআইসি বরাদ্দ পেয়েছেন তিনি।
অপরদিকে, জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. জামাল হোসেনের নামে হালি হাওরের ১১ নম্বর পিআইসি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পাগনা হাওরের ৩৩ নম্বর পিআইসি ফেনারবাঁক ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য মো. আনোয়ার হোসেন, ৩২ নম্বর পিআইসি ৩ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য মো. শাহাব উদ্দীন, ৩৮ নম্বর পিআইসি ৪ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য মো. আলমগীর হোসেনের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বেশ কয়েকজন সাবেক ইউপি সদস্যকেও বাঁধের কাজে যুক্ত করে বরাদ্দ নয়ছয়ের পথ খোঁজা হয়েছে। এ নিয়ে হাওর পারে নীরব অসন্তোষ থাকলেও প্রশাসনের ভয়ে কেউ কথা বলতে রাজি হয় না।
জানা যায়, জামালগঞ্জে এ বছর আবাদ করা হয়েছে ২৪ হাজার ৪৯৫ হেক্টর বোরো জমি। ৩২ হাজার ৫০০ জন কৃষকের বোরো ফসল রক্ষায় সরকার বরাদ্দ দিয়েছে ৭ কোটি ৬৩ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। ৪৪টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) অনুকূলে সরকার এ বরাদ্দ দিয়েছে। তবে কৃষকের স্বার্থে সরকারের বরাদ্দকৃত অঢেল অর্থের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে হাওরখেকোদের পেটে। হাওর রক্ষা বাঁধ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়মবহির্ভুত কর্মকাণ্ড হাওরকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিবে বলে মনে করছেন হাওর সচেতন মানুষেরা।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন পুরকায়স্থ জানিয়েছেন, ইউপি সদস্যদের বাঁধের কাজ দেওয়ার অন্যতম কারণ, তারা প্রশাসনের হুকুম যথাযথভাবে পালন করবে। কোন কোন মেম্বার আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি অকপটে শিকার করে। কিন্তু কর্তাব্যক্তির ভয়ে তা প্রকাশ না করার অনুরোধ জানায়। তাই দুর্নীতির বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, যে সত্যটা বলে তার বারোটা বাজানো হয়। যার সাক্ষি আমি নিজেই। হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন করায় আমার কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হয়েছে। আমি কেন মানববন্ধন করলাম। এভাবে হুমকি—ধমকি দিয়ে হাওরে দুর্নীতির জাল পাতা হয়েছে। তাদের কাছে হাওরের নিরাপত্তার বিষয়টি মুখ্য নয়।
উপজেলা কাবিটা প্রকল্প বাস্তবায়ন মনিটরিং কমিটির এক সদস্য বলেন, টাকা দিয়ে পিআইসি নেওয়া কিংবা বিল তোলার সময় টাকা দেওয়ার অভিযোগ আমার কাছেও আছে। এ বিষয়গুলো মিটিংয়ে উত্থাপন করেছি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তা অস্বীকার করে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ চেয়েছেন। যে প্রমাণ হুমকি—ধমকি ও ভয়—ভীতির কাছে পরাভূত।
এ ব্যাপারে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইকবাল আল আজাদ বলেন, পার্সেন্টিজ ও টাকা দেওয়ার ব্যাপারে আমার কাছেও অনেকে বলে। কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খোলে না। তাই প্রতিবাদও হয় না। কৃষকের কথা বলতে গিয়ে কৈফিয়তের শিকারও হতে হয়। সেটা অবশ্যই নিন্দনীয়। হাওর পারের কৃষকের কণ্ঠ রোধের পাশাপাশি আমাদের ক্ষমতাও খর্ব করা হচ্ছে। একজন জনপ্রতিনিধি হিসাবে অনেক কিছুই বলি, তবে কাজ হয় না। বাঁধের কাজে নিকটবর্তী কৃষককে যুক্ত করার কথা। কিন্তু বাস্তবে সব নিয়মনীতি ও আইন প্রশাসনের কাছে জিম্মি।
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা বললেন, হাওরে দ্রুত বাঁধের শেষ করা হচ্ছে। যারা কাজ করছে, তাদেরকে দ্রুত বিল দেওয়া হচ্ছে। বিল নিতে কেউ হয়রানির শিকার হচ্ছে বলে আমার জানা নেই।
হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ সারাক্ষণ মনিটরিং করছেন জানিয়ে সুনামগঞ্জ—১ আসনের সংসদ সদস্য রনজিত চন্দ্র সরকার বলেন, আইন—শৃঙ্খলার মিটিংয়ে আমি চার উপজেলার ইউএনওকে পরিস্কার বলে দিয়েছি, বাঁধের কাজের দায়িত্ব আপনারা আপনাদের মতো করে দিয়েছেন। আমার সাফ কথা হাওরের মানুষ যাতে কোন বিপদে না পড়ে। যদি কেউ টাকা দিয়েছে কিংবা দিচ্ছে এমনটা আপনাদের কাছে শিকার করে তাহলে তার কথা রেকর্ড করে আমার কাছে দেন, আমি বিষয়টা দেখব।
জৈন্তাবার্তা/এমকে




