ছবি: সংগৃহীত
স্কুল থেকে এসে দেখি বাড়িতে হুলস্থুল কান্ড! একজন বিশেষ ব্যক্তিকে ঘিরে বাড়ির সবাই আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠেছেন। রহিমা খালা, আব্দুল চাচা, আমার সহপাঠী সাফার বড় ফুফু, রাজনের বাবা, শিমুলের মাসহ আরো অনেকেই এসেছেন আমাদের বাড়িতে। ছোট ছোট অনেক বাচ্চাও দেখছি আশেপাশে খেলা করছে। সবার হাতে হাতে চকলেট। কেউ কেউ খাচ্ছে, কেউ আবার চোখ দিয়ে মন ভরে তৃপ্তি নিচ্ছে। ঘরের এক পাশে আম্মু দাঁড়িয়ে আছেন। আমি সবার পাশ কাটিয়ে দৌড়ে গিয়ে আম্মুকে জড়িয়ে ধরলাম। আম্মু আমার কাঁধ থেকে স্কুল ব্যাগটা নামালেন। আমি যে এসেছি সেদিকে কারো কোনো খেয়াল নেই। অবশ্য খেয়াল করার কথাও না৷ সাদা শার্ট পড়া কেউ একজন সবার সাথে হেসে হেসে কুশল বিনিময় করছেন৷ সবার দৃষ্টি এখন উনার দিকেই নিবন্ধন করা। আমি এখান থেকে মুখটা ঠিক স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি না৷ দেখার চেষ্টাও করছি না৷ সেদিকে তাকাতে আমার একদম ইচ্ছে করছে না। আমার প্রচন্ড খিদে পেয়েছে। আম্মুকে বললাম কিছু খেতে দিতে।
ঠিক সেই মুহুর্তে আচমকা পিছন থেকে অপ্রস্তুত অবস্থায় কেউ একজন এসে আমাকে কোলে তুলে নিলেন, আমি চমকে উঠলাম। খেয়াল করে দেখলাম কিছুক্ষণ আগে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা সেই অপরিচিত বিশেষ ব্যক্তিটি! মুখের দিকে চোখ পড়তেই বুকের ভেতর ধুকপুক করে শব্দ করতে লাগলো। হৃদপিণ্ড দ্রুত গতিতে উঠা-নামা করছে। কেমন জানি আস্তে আস্তে ভয় লাগতে শুরু করলো। আমি বারবার কোল থেকে নেমে আম্মুর কাছে যেতে চাচ্ছি। কিন্তু উনার দু'হাতের বন্ধন আমার উপর এতটাই শক্ত ছিল যে, কিছুতেই নিজেকে ছাড়াতে পারছিলাম না। উনি কপালে আদর দিয়ে এক হাত আমার গালের মধ্যে রেখে অপলক দৃষ্টিতে দিকে তাকিয়ে আছেন।
আমি এই মুহুর্তে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি উনার চোখে অবাধ জল কেমন করে ছলছল করছে। বাঁধ না মেনে গাল বেয়ে টপটপ করে আমার উপর গড়িয়ে পড়ছে। উনার এই অসহায় দৃষ্টি আমার বুকের ভেতর শ্রাবণের উথাল-পাতাল ঢেউ সৃষ্টি করছে। উনি এবার বুকের ভেতর শক্ত করে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমি এবারও উনার কাছ থেকে নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করছি। তারপর মুখটা নিজের মুখের কাছাকাছি এনে নাকে নাক ঘেঁষতে ঘেঁষতে কোল থেকে নামিয়ে সোফার উপর দাঁড় করালেন। এখন দুজনের উচ্চতা অনেক টাই সমান দেখাচ্ছে। উনার দুহাত দিয়ে আমার গালটা আলতো স্পর্শে ছুঁয়ে দিয়ে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে কান্না জড়িত কন্ঠে বললেন,
-আমার সোনা মেয়ে, আমার মা, আমার পৃথিবী বলেই আবারও আমাকে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। হঠাৎ খেয়াল করলাম আমার চোখ দিয়েও জল পড়ছে। কেন পড়ছে জানি না৷ উনার মতো এত অনুভূতি যে আমার ভেতরে কাজ করছে না সেটা বেশ বুঝতে পারছি। তবুও কেন জানি ভীষণ কান্না পাচ্ছে। কেন পাচ্ছে তাও জানি না।এরপর উনার কণ্ঠনালীতে ভারি পাথর আটকে যাওয়ার মতো গলার ভেতর থেকে আর কোনো শব্দ বেরিয়ে আসতে পারলো না।
হ্যাঁ, উনিই সেই বিশেষ ব্যক্তি! 'আমার জন্মদাতা পিতা'। জন্মের পর এই প্রথম আমি উনাকে দেখছি। তাই হয়তো উনার জন্য এই মুহুর্তে আমার ভেতর কোনো মায়া, আবেগ, অনুভূতি কাজ করছে না। দীর্ঘ আট বছর প্রবাস জীবন কাটিয়ে আজ উনি বাড়িতে পা রেখেছেন। বাবার আদর ভালোবাসা কেমন হয় তা আমি জানি না৷ বাবারা দেখতে কেমন হয় তাও জানা নেই। জন্মের পর থেকে শুধু মা'কেই দেখে আসছি৷ মায়ের ভালোবাসা ছাড়া অন্য সব ভালোবাসা গুলোর কাছে বড্ড অপরিচিত।
ভদ্রলোক বাড়িতে আসার পর বাড়িটা ভরপুর হয়ে উঠেছিল। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও দুই মাস পার হওয়ার পরও আমি উনাকে বাবা বলে ডাকতে পারিনি। আমার ভেতরে কেমন জানি অস্বস্তি লাগতো। হুট করে এত বছর পরে কেউ একজন এসে নিজেকে বাবা বলে দাবি করলেই কি আমি তাঁকে সহজে বাবা বলে মেনে নিতে পারবো? কিন্তু আমার মুখ থেকে বাবা ডাক শুনার জন্য উনার ভিতরের আকুলতা উনার আমি ঠিক বুঝতে পারতাম।
একদিন গভীর রাতে প্রচন্ড জ্বরে আমি বিছানায় পড়ে আছি। আবছা আলোয় দুজন মানুষকে দুইপাশে দেখতে পাচ্ছি। সেদিন ঘুমের ঘোরে অবচেতন মনে আমি প্রথম উনাকে বাবা বলে ডাকি। নিজের অজান্তেই বুকের ভেতর একটা প্রশান্তি অনুভব করি৷ এই বাবা শব্দটা কত মধুর কত শান্তির অথচ গত দুইমাস ধরে এই শব্দ থেকে পালাতে আমি কতই-না চেষ্টা করেছি। সব মান অভিমান ভুলে সেদিন বাবাকে আমি আপন করে নেই।
সেই থেকে শুরু আজ ২১টি বছর ধরে এই বাবা নামক বটবৃক্ষ ছায়া হয়ে পাশে আছেন। বাবারা সন্তানদের একটু ভালো থাকার জন্য কত কিছু ত্যাগ করে। এই জন্যই হয়ত বাবাদের বটবৃক্ষের সাথে তুলনা করা হয়। নিজে পুড়ে সবাইকে ছায়া দিতে তারা সদা প্রস্তুত।
এম সি




