ছবি : সংগৃহীত
কেউ ক্ষেত-খামারে কাজ করেন। কেউবা বিক্রি করেন দুধ। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে তাদের একটিই পরিচয়। তারা ‘আসামি’। বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলার আসামি হিসেবে তারা সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে ভিড় জমিয়েছেন জামিন চাইতে। কারো বাড়ি পঞ্চগড়। কারো বাড়ি টেকনাফ। পথের দূরত্ব ঘুচিয়ে তারা এক হয়েছেন সাদা গম্বুজ বিশিষ্ট ভাবগম্ভীর ভবন প্রাঙ্গণে। প্রত্যাশা একটাই। ন্যায় বিচার। বসার যুতসই স্থান না পেয়ে কেউ বসেছেছেন করিডোরে। কেউ কোর্ট প্রাঙ্গনের বাগানে গাছের ছায়ায়। ন্যায় বিচাররের প্রতীক থেমিসের মূর্তির পাদদেশে। পাশ দিয়ে গেলেই যে কারো প্রশ্ন জাগতে পাওে, বিরস বদনে অসহায়ের মতো বসে গ্রামের সহজ-সরল লুঙ্গি পরিহিত এই মানুষগুলো কোনো অপরাধ করতে পারে ? তারা সন্ত্রাস করতে পারে ? রাজপথে নেমে গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নি সংযোগ কিংবা নাশকতা চালাতে পারে ?
কিন্তু আইনতো আইনই। আইন কারো ক্ষেত্রে অন্ধ। কারো ক্ষেত্রে অন্ধকূপ। মাকড়সার জালের মতো। শক্তি থাকলে ছিন্ন করে বেরিয়ে আসো। না হলে জালে প্যাঁচ খেয়ে কারাভোগ করো ! কিন্তু এই মানুষগুলো মূলত ‘অন্ধ আইন’র শিকার। এ কারণে এজাহার কিংবা চার্জশিটে নাম যেহেতু আছে, তাই তারা আসামি। নরসিংদী থেকে জামিনের জন্য আসা মিরাজ ফকির জানান, তার ছেলে বিএনপি করতো। দ্বাদশ নির্বাচনের বহু আগে থেকেই তার ছেলে বাড়ি ছাড়া। এরই মধ্যে জানতে পারলেন, তার ছেলের বিরুদ্ধে নতুন মামলা হয়েছে। ওই মামলায় মিরাজ ফকির নিজেও আসামি ! তথ্যটি পেয়ে আকাশ থেকে পড়েন মিরাজ। জ্ঞানও হারিয়ে ফেলেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মিরাজের চোখে অন্ধকার নেমে আসে। অভিযোগ সত্য কি মিথ্যা সেই বিচারতো পরে ! পুলিশী হয়রানি থেকে বাঁচতে আগেতো তাকে জামিন নিতে হবে। তাই অন্য ৮ আসামির সঙ্গে তিনিও হাইকোর্টে এসেছেন আগাম জামিন নিতে। অন্যরা আইনজীবী ধরেছেন। মিরাজ ফকির তাদের সঙ্গে আছেন। জানেন না আজ তার জামিন হবে কি না !
এক মিরাজ ফকির নন। এ রকম শত শত মিরাজ ফকিরের দেখা মেলে গতকাল সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে। নির্বাচনের পর আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে তারা এখন ভিড় জমাচ্ছেন হাইকোর্টে। মাসের শেষ দিকে এসে প্রতি কর্মদিবসেই এমন ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বগুড়া থেকে জামিন নিতে আসেন যুবদল নেতা আলী আকবর। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা থানায় বেশ কয়েকটি মামলা করে পুলিশ। এতে আসামি করা হয় তিনিসহ অন্তত: পাঁচ শতাধিক বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীকে। মামলার অভিযোগের বিন্দু মাত্র সত্যতা নেই। কারণ ঘটনার দিন তিনি এলাকায়ই ছিলেন না। এসব মামলায় আসামিদের মধ্যে রয়েছেন নিরীহ কৃষক, মুদি ব্যবসায়ী, দুধ বিক্রেতা ও দিনমজুর। যারা কোনো দিনই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।
সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম জানান, বুধবার সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলার প্রায় ৭টি আবেদনে ৫৬ জনকে জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। ৪ সপ্তাহের জন্য এ জামিন মঞ্জুর করেন আদালত। এছাড়া এদিন ঠাকুরগাঁও, টাঙ্গাইল, লালমনিরহাট জেলা থেকে কয়েকশ’ লোক জামিন নিতে আসেন হাইকোর্টে। এর মধ্যে অন্তত: ৫২ জনের জামিন হয়। তবে সারাদিন অপেক্ষা করেও জামিন পাননি পটুয়াখালির মেহের আলী। নির্বাচন-উত্তর সহিংসতার মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে। আওয়ামীলীগ নেতাদের সঙ্গে ওঠাবসা করলেও বাঁচতে পারেননি ‘মিথ্যা’ মামলা থেকে। লঞ্চে করে গ্রাম থেকে এসেছেন। নির্ঘুম রাতের ছাপ লেগে আছে চোখের দুই পাতায়। একসঙ্গে ১৯ জন এসেছেন তারা। জামিন নিতে এসেই আদালত প্রাঙ্গনে প্রবেশকালে পেয়েছেন বাঁধা। জেরার মুখে পড়েছেন পুলিশের। আইনজীবীর নাম ঠিকঠাক বলতে পারায় ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয় তাকে। মেহের আলীর মতো শত শত জামিন প্রার্থীকে গতকাল দেখা যায় আদালত প্রাঙ্গনে। এসব জামিন প্রার্থী যখন আদালত প্রাঙ্গনে জোটবন্ধ হয়ে বারান্দায়, করিডোর কিংবা প্রাঙ্গনে হাটাচলা করেন, তখন মনে হয় একেকটি মিছিল। সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট সাইফুদ্দীন রতন বলেন, এ দৃশ্য এখন প্রতিদিনের।
জৈন্তাবার্তা/জেএ




