ছবি : সংগৃহিত
বৈধভাবে ব্যবসা করতে সিটি করপোরেশন থেকে নিতে হয় ট্রেড লাইসেন্স। যার পেছনের পাতায় ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত ২০টি আইন ও নিয়ম উল্লেখ করা হয়েছে। যা ব্যবসায়ীদের মানতে হবে। এই নিয়মের ‘ত’-এ বলা হয়েছে, ‘মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে দায়েরকৃত রিট পিটিশনে ১৬৯৬/২০১৪ নং এ প্রদত্ত আদেশ অনুযায়ী সাইনবোর্ড/নামফলক বাংলা ভাষায় লেখা বাধ্যতামূলক।’
২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এক আদেশে দেশের সব সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বরপ্লেট, সরকারি দফতরের নামফলক এবং গণমাধ্যমে ইংরেজি বিজ্ঞাপন ও মিশ্র ভাষার ব্যবহার বন্ধ করতে সরকারকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলেন।
আদালতের আদেশের পর নড়েচড়ে বসতে দেখা গিয়েছিলো দুই সিটি করপোরেশনকে। ২০১৮ সালে এ বিষয়ে পত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তিও দিয়েছিলো ঢাকার দুই নগর কর্তৃপক্ষ।
এরপর অভিযানও চলে। আলোচনা ওঠে- ফেব্রুয়ারি মাস আসলেই বাংলা ভাষার দিকে নজর দেয় সিটি করপোরেশন।
আদালতের আদেশকে সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্সে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাতেও যেন কর্ণপাত নেই।
আদালতের আদেশের ১০ বছর পরও প্রশ্ন উঠেছে, এই নিয়ম মানছেন কতজন? রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডের ভাষা ইংরেজি।
ছোট-মাঝারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বড় ও নামকরা— সব প্রতিষ্ঠানেরই সাইনবোর্ড বা নামফলক ইংরেজিতে লেখা হয়।
অনেকে আবার এই সাইনবোর্ড লেখার বিষয়েও বেশ কৌশলী। বড় আকারে ইংরেজিতে সাইনবোর্ড লিখে, তার পাশে প্রতিষ্ঠানের নাম ছোট করে লিখছেন বাংলায়।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে টুইঙ্কেল বেবি নামে এক প্রতিষ্ঠানকে দেখা গেছে এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে৷ পাশের গার্ডিয়ান নামে আরও এক প্রতিষ্ঠান একই পথ ধরেছে।
রিংরোড এলাকায় তাকালে দেখা যায়, বেশিভাগ প্রতিষ্ঠানই তাদের সাইনবোর্ড করেছে ইংরেজি ভাষায়। কোথাও বাংলার ছাপ নেই।
রেস্তোরাঁ, ব্যায়ামাগার, ইলেক্ট্রনিক পণ্যের দোকান, সেলুন, ফার্মেসি— সর্বত্রই ব্যবহার হচ্ছে ইংরেজি ভাষা ও শব্দ।
এই তালিকায় রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও। ক্যামব্রিয়ান স্কুল ও কলেজের একটি শাখা রয়েছে মোহাম্মদপুর রিংরোডের জাপান গার্ডেন সিটির ঠিক বিপরীতে। বহুতল ভবনের উপরের দিকের পুরোটাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামফলকে ঠাসা। যার সবগুলোই লেখা হয়েছে ইংরেজি বর্ণমালায়। কেবলমাত্র ভবনের প্রবেশ মুখে ছোট আকারে একটি নামফলক রয়েছে বাংলায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তা নাদিয়া বলেন, এখন পর্যন্ত সিটি করপোরেশন এ বিষয়ে তেমন কিছু বলেনি।
এই কর্মকর্তা দাবি করেন, ভবনের প্রবেশমুখে তাদের বাংলায় নামফলক রয়েছে।
পাশেই একটি ব্যায়ামাগার তাদের নামফলক করেছে সম্পূর্ণ ইংরেজি বর্ণমালায়। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা বিপ্লব ঢাকা মেইলের কাছে দাবি করেন, বাংলায় নামফলক রাখার বাধ্যবাধকতার বিষয়ে তারা জানেন না।
এলাকাটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫ এর আওতাধীন। করপোরেশনের এ অঞ্চলের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মোতাকাব্বীর আহমেদ। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে প্রায়ই অভিযান পরিচালনা করা হয়। সময় স্বল্পতার জন্য সবসময় সম্ভব হয় না।
বাংলায় নামফলক রাখার বাধ্যবাধকতার বিষয়ে অনেকেই জানেন না। এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা বলেন, না জানার তো কিছু নাই। তার ট্রেড লাইসেন্সের পেছনে লেখা আছে। অভিযান পরিচালনা করা হয়।
ইংরেজি শব্দের ব্যবহার ও বাংলাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় সবচেয়ে এগিয়ে ধানমন্ডির সাত মসজিদ রোড। রেস্তোরাঁয় ঠাসা এই এলাকায় প্রায় ৯০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের নাম ইংরেজি ভাষায় এবং লেখাও হয়েছে ইংরেজি বর্ণে। যার কোথাও বাংলার দেখা নেই।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নগর ভবন এলাকার চিত্রও একই। গুলশান এলাকার বহু প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড সম্পূর্ণ ইংরেজিতে।
বাসাবো, সবুজবাগ, মিরপুর, খিলগাঁও, গোড়ান, তালতলা, কাফরুল, ফার্মগেটসহ পুরো রাজধানীতেই এখন একই চিত্র।
যদিও নগর ভবন কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, তারা নিয়মিত এসব বিষয়ে অভিযান পরিচালনা করেন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মকবুল হোসেন বলেন, আমাদের নিয়মিত অভিযান হয়। সাইনবোর্ডের সাইজ, শর্ত মানা হচ্ছে কিনা। আমাদের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তারা অভিযান পরিচালনা করেন।
এই কর্মকর্তা দাবি করেন, গণমাধ্যমকর্মীরা তাদের এই অভিযান নিয়মিত কাভার করেন না।
করপোরেশনের ২নং অঞ্চলের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেন, আমি আমার অঞ্চলে অভিযান করেছি। নগর ভবন থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা অভিযান করছেন। অভিযান চলছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫ এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন সরকারের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, এ বছর এখনো তারা সাইনবোর্ডে বাংলা লেখার বিষয়ে কোনো অভিযান করেননি।
এই কর্মকর্তা জানান, নগর ভবন থেকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
জৈন্তাবার্তা/জেএ




