ছবি:সংগৃহীত
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে স্বদেশের মাটিতে ফিরেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা ৪৪ মিনিটে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান।
দেশে ফিরে রাজধানীর ৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে (৩০০ ফুট সড়ক) আয়োজিত গণসংবর্ধনায় অংশ নিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘সকলকে সঙ্গে নিয়ে আমি একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই।’ দীর্ঘ নির্বাসনের পর তার এই প্রত্যাবর্তনকে দেশের টালমাটাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন আশার বার্তা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
গণসংবর্ধনায় জনসমুদ্র
বিমানবন্দর থেকে পূর্বাচল, গুলশান হয়ে ৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে পর্যন্ত রাজধানীজুড়ে লাখো মানুষের ঢল নামে। বিকেল পৌনে ৪টায় গণসংবর্ধনাস্থলে পৌঁছে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে মঞ্চে আসন নেন তারেক রহমান। তাকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য রাখার আহ্বান জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
প্রায় ১৬ মিনিটের বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, ‘এই প্রিয় মাতৃভূমি ১৯৭১ সালে লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে। যেমনভাবে ৭১-এ মানুষ স্বাধীনতা এনেছিল, তেমনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সর্বস্তরের মানুষ দেশকে রক্ষা করেছে। আজ বাংলাদেশের মানুষ কথা বলার অধিকার চায়, গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পেতে চায়।’
তিনি আরও বলেন,‘এই দেশে পাহাড়ের মানুষ আছে, সমতলের মানুষ আছে-সবার জন্য এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যে স্বপ্ন একজন মা তার সন্তানের জন্য দেখে। অর্থাৎ, আমরা একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই।’
সংকটময় সময়ে প্রত্যাবর্তন
তারেক রহমান এমন এক সময়ে দেশে ফিরলেন, যখন দেশ এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট অতিক্রম করছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ষড়যন্ত্র, সহিংসতা এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড দেশকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশেষ করে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থী শরিফ ওসমান বিন হাদিকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যার ঘটনা জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। একইসঙ্গে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নির্বাসনের রাজনীতি ও ‘৩১ দফা’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের রাজনৈতিক উত্থান আকস্মিক নয়। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে তিনি তৃণমূল পর্যায়ে দলকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ‘তৃণমূল সমন্বয় সভা’র মাধ্যমে তিনি দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত গড়ে তোলেন।
দীর্ঘ নির্বাসনে থেকেও তিনি দল পরিচালনার পাশাপাশি রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে ‘৩১ দফা’ রূপরেখা প্রণয়ন করেন। ভার্চুয়াল বক্তব্য ও ডিজিটাল যোগাযোগের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংযুক্ত থাকা তারেক রহমানকে তরুণ প্রজন্মের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা।
মায়ের পাশে তারেক রহমান
গণসংবর্ধনা শেষে তারেক রহমান সন্ধ্যায় এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে যান। প্রায় দেড় ঘণ্টা হাসপাতালে অবস্থান শেষে রাত সাড়ে ৭টার দিকে তিনি হাসপাতাল ত্যাগ করেন।
রাত ৮টা ২০ মিনিটে তিনি গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাসায় পৌঁছান। বাড়িটি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের বাসভবন ‘ফিরোজা’র পাশেই অবস্থিত। তারেক রহমান সেখানেই অবস্থান করবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
নতুন প্রত্যাশার প্রতীক
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন কেবল একজন নেতার দেশে ফেরা নয়-বরং এটি গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও নিরাপদ রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। দীর্ঘ নির্বাসনের অগ্নিপরীক্ষা পেরিয়ে তিনি এখন দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছেন-এমন প্রত্যাশাই করছেন বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা।
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




