নলকুপ
প্রাচীনকাল থেকেই সিলেট অঞ্চল প্রাকৃতিক-খনিজ সম্পদে ভরপুর। ভৌগোলিক ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে সিলেট অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। সিলেটের সুপেয় পানি দেশ-বিদেশে প্রসিদ্ধ। সুপেয় পানি, স্বাদু জল বা মিঠা পানি এমন পানি বা জল যাতে লবণ নেই বা থাকলেও তাতে লবণের পরিমাণ খুবই কম। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট শৈলপ্রাচীর, জলপ্রপাত, হ্রদ, নদী, তুষারপাত, বরফ ইত্যাদি পানিবাহী মাধ্যমগুলো স্বাদু জলের প্রধান উৎসস্থল। প্রসারমান ব্যবসা-বাণিজ্য, ভূরাজনৈতিক পটভূমি, সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্য, ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক ভূমিকা, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যময় সাহিত্য-সংস্কৃতির ব্যাপক চর্চা আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সিলেটকে দিয়েছে স্বতন্ত্র মহিমা, করেছে তাৎপর্যময়। স্বাভাবিকভাবেই সিলেটের উল্লেখিত প্রেক্ষাপট তৈরি হওয়ার পিছনে এখানকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, পরিবেশ, বন-বনানী, আবহাওয়া, পারিপার্শি¦কতার ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু ইদানিং সিলেটে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকহারে নেমে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় নলকূপের পানিতে লবণাক্ততা বেড়েছে। অপরিকল্পিতভাবে গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি তোলার কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে গবেষকরা মনে করছেন।
বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেটের প্রায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পানির স্তর নেমেছে ৪০ থেকে ৬০ ফুট নিচে। ফলে সাধারণ নলকূপে পানি উঠছে না। আবার পাহাড়-টিলা অধ্যুষিত কিছু এলাকায় নলকূপ স্থাপনই করা যায় না। সিটি করপোরেশনও পারছে না চাহিদামতো পানি সরবরাহ করতে। সিলেট নগরী ও সদর উপজেলার বেশকিছু এলাকায় পানির জন্য রীতিমতো হাহাকার শুরু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সিলেট অঞ্চেলের বন-বাদাড় যুগ যুগ ধরে এ অঞ্চলকে চিরসবুজ, ছায়াময়-মায়া দান করেছে। এ অঞ্চলের বন-বনানীতে, নদনদীতে, হাওর জলে জড়িয়ে আছে মানবসভ্যতা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার হরেক রকম উপাদান। অথচ আধুনিক সভ্যতার অতি উৎসাহী ব্যবহার এ চিরহরিৎ বনাঞ্চলের হৃদপুষ্ট চেহারাকে ক্রমশ ম্লান করে দিচ্ছে। অবাধে বৃক্ষনিধন, বৃক্ষরোপণে অনীহার কারণে প্রাণিকুল হুমকির সম্মুখীন। নিম্নমুখী ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সমস্যা দূরিকরণে গাছ লাগানোর পাশাপাশি নদ-নদী, খালগুলো সংস্কার করে পানির প্রবাহ বাড়াতে হবে। পুকুর ভরাট বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব হবে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে সারা দেশেই পানির স্তর নিম্নমুখী। সিলেটের প্রায় উপজেলায় পানির স্তর নিম্নমুখী। জৈন্তাপুর ও কানাইঘাটের দুই-তিনটি ইউনিয়নে পানির স্তরের সমস্যা নেই, সেখানে মূলত পাথরের জন্য নলকূপ স্থাপন করা যায় না।’ জলবায়ু পরিবর্তন, বৃষ্টি না হওয়া, খাল, নদী, পুকুর ভরাট হয়ে যাওয়া; সর্বোপরি বাসাবাড়ির কাজের জন্য মাত্রাতিরিক্তভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে এমনটা হচ্ছে। আবার সিলেট অঞ্চলে বৃষ্টিপাতও কম হচ্ছে। সব মিলিয়ে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান জানান, সিটি করপোরেশন থেকে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। বর্ধিত এলাকায়ও পানি সরবরাহ করা হবে। সিলেট ওয়াসা গঠন করা হয়েছে। শিগগিরই এর কার্যক্রম শুরু হবে।
এ প্রসঙ্গে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মুশতাক আহমেদ জানান, দিন দিন আমাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে পুকুর, বিল ভরাট হচ্ছে। সেই সঙ্গে নদ-নদী. খাল দখল হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া খাদ্য উৎপাদনে যে পানি দরকার তা পুকুর, বিল, নদ-নদী থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। এজন্য মাত্রাতিরিক্তভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। তাতে প্রতি বছর পানির স্তর নিচে নামছে। যেসব খাল-বিলের মাধ্যমে পানি ভূগর্ভস্থ হবে, প্লাস্টিক বর্জ্য তাতে নানাভাবে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে। এটাও পানির স্তর নিচে নামার অন্যতম কারণ। গাছ লাগানোর পাশাপাশি নদ-নদী, খালগুলো সংস্কার করে পানির প্রবাহ বাড়াতে হবে। পুকুর ভরাট বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলে ধীরে ধীরে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ পাওয়া সম্ভব।
বৃক্ষ ও প্রকৃতি গবেষক আফতাব চৌধুরী বলেন- সিলেট জেলার পরিবেশ দূষণ প্রসঙ্গ ও পানি সংকট এ সময়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্নভাবে দূষিত হচ্ছে এখানকার স্বাস্থ্যকর পরিবেশ। টিলা-পাহাড় কাটা হচ্ছে নির্বিচারে। সিলেট সদর, বিয়ানিবাজার, গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জসহ প্রায় প্রতিটি উপজেলায় টিলা ও পাহাড় কাটা হচ্ছে। বিগত ১০ বছরে টিলা ও পাহাড় কাটার কারণে টিলা-পাহাড়ের পরিমাণ ৫০ শতাংশ নেমে এসেছে। অবাধে বালু উত্তোলন ও পুকুর জলাশয় ভরাট করা হচ্ছে। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে মাটির নিচ থেকে পাথর উত্তোলন করা হয়। জেলায় ইটভাটার সংখ্যা প্রায় ১৫০টি। এসব কারনে সাধারণ নলকূপে উঠছে না পানি। বাড়ছে লবণাক্ততা।
সিলেট সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা যায়, নগরীর সাবেক ২৭টি ওয়ার্ডে প্রায় ১৭ হাজার পানির গ্রাহক রয়েছেন। এই ১৭ হাজার গ্রাহককেও নিয়মিত পানি সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরো ১৫টি ওয়ার্ড। বর্ধিত ওয়ার্ডে আরো অন্তত অর্ধলাখ খানা রয়েছে। যেগুলো পানি সরবরাহের আওতার বাইরে। বর্ধিত এলাকার অনেক পাড়া-মহল্লায় পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় পানি সংকট তীব্র হয়েছে। বর্তমানে একটি শোধনাগার ও ৪১টি গভীর নলকূপ থেকে পানির সরবরাহ করা হচ্ছে। নগরীতে চার কোটি লিটার পানির চাহিদা রয়েছে। তারা সাধ্যমতো সরবরাহের চেষ্টা করছেন।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সিলেটের তথ্যমতে, সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় পানির স্তর নিম্নমুখী। এর মধ্যে সিলেট নগরীর বিভিন্ন অংশ, সিলেট সদর ও দক্ষিণ সুরমা ও টিলা অধ্যুষিত কানাইঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলার দু‘একটি ইউনিয়ন রয়েছে। অনেক জায়গায় পানির স্তর ৩২-৪০ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। যার জন্য সাবমার্সিবল টিউবওয়েল স্থাপন করে দিতে হচ্ছে।
সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে- জেলার জৈন্তাপুর উপজেলার একাধিক গ্রামে মাটির তলদেশে প্রচুর পাথরের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ফলে টিউবওয়েল বসিয়ে সেখানে সুফল মেলে না। তাই যুগ যুগ ধরে এখানে পানির একমাত্র উৎস কুয়া। স্থানীয়ভাবে যাকে ইন্দারা বলা হয়। এর ওপর নির্ভরশীল কয়েক হাজার মানুষের জীবন। উপজেলার নিজপাট ইউনিয়নে রয়েছে নয়টি ওয়ার্ড। গ্রাম রয়েছে ৬৫টি।
পরিবেশবিদ আব্দুল করিম কিম জানান সিলেট বিভাগের ১০৬টি নদীর যৌবন বহতা বা পানিতে টইটম্বুর ছিল। কিন্তু এসব নদী তো নেই, নদীর নামও অনেকে জানে না। সিলেট বিভাগ গাইডে বা সরকারি হিসেবে বিভাগজুড়ে নদীর সংখ্যা রয়েছে-৩৬টি। এই ৩৬টি নদীর ছোট্ট অনেক নদীও দখলে দূষণে বিলিনের পথে ।
জৈন্তা বার্তা/ শাহিদ হাতিমী




